কোলেস্টেরল এবং এর ঔষধের ব্যবহার

cholesterol and use medicine

কোলেস্টেরল এবং এর ঔষধের ব্যবহার

শরীরের চর্বি বা কোলেস্টেরল নিয়ে নানা ধরনের ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে আছে । এমনকি ডাক্তারদের মধ্যেও এটা আছে । বিশেষ করে মেডিসিনে যারা প্র্যাকটিস করেন তাদের অনেকের মধ্যেও একটি বদ্ধ ভুল ধারণা আছে । ধারণাটি হলো- যতদিন কোলেস্টেরল বেশি পাওয়া যাবে ততদিন ঔষধ খেতে হবে । ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার ।

শরীর গঠনে অন্যান্য উপাদানের মত চর্বি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । কোটি কোটি দেহকোষের প্রাচীর, বহুসংখ্যক হরমোনসহ অসংখ্য শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া- বিক্রিয়ার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো কোলেস্টেরল । প্রাণী মস্তিষ্কের প্রায় পুরোটাই কোলেস্টেরল দিয়ে তৈরি । তাহলে কোলেস্টেরল খারাপ হবে কেন? বিষয়টি খারাপের ভালোর নয় । 

প্রতিটি জিনিসের একটি মাত্রা থাকে । মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই সমস্যা দেখা দেয় । আমাদের কোলেস্টেরল মাত্রা জানতে হলে অন্তত ১০ ঘন্টা খালি পেটে একটি লিপিড প্রোফাইল করা দরকার । লিপিড প্রোফাইলে Total cholesterols,High density Lipoprotein-HDL, Low density Lipoprotein-LDL এবং Triglycerides এর বিস্তৃত বিবরণ থাকে ।  এই চারটি উপাদানের আনুপাতিক উপস্থিতি পরবর্তী চিকিৎসা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । অনেকে শুধু Total cholesterols এবং Triglycerides পরীক্ষা করার উপদেশ দিয়ে থাকেন । তাতে করে HDL এবং LDL এর পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে বোঝা সম্ভব হয় না । সুতরাং বয়স ৩০ হলে অথবা পরিবার বা বংশে যদি অল্প বয়সে কেউ হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তাহলে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করা হয় ।

ভালো বনাম খারাপ কোলেস্টেরল :

রক্তনালীর দেয়ালে জীবন্ত কোষের অবিরাম ভাঙা-গড়া চলতে থাকে । সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটি পারফেক্ট ব্যালেন্স থাকে । কিন্তু যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল আছে, যারা ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ করেন, স্থুল শরীর ব্যায়ামহীন  কাটান তাদের রক্তনালীর জীবন্ত কোষের ভাঙা-গড়া প্রক্রিয়াটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে । কোষের এই ভাঙা-গড়া প্রক্রিয়ায় HDL কোলেস্টেরল রক্তনালী রক্ষায় পজেটিভ ভূমিকা পালন করে । এজন্য একে গুড কোলেস্টেরল বলা হয়ে থাকে । 

আর LDL কোলেস্টেরল বিশেষ করে পরিবর্তিত Oxidized LDL রক্তনালীর দেয়ালে এক ধরনের প্রদাহ সৃষ্টি করে । ধীরে ধীরে এই প্রদাহের ফলে রক্তনালীর গাত্রে চর্বির দলা (Plaque) গড়ে ওঠে রক্তনালী সরু করে রক্তের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে । সাধারণ মানুষ এটাকে ব্লক বলে থাকেন । কোন ব্লক যখন রক্তনালীর কমপক্ষে 70% ভাগ লুমেন সরু করে দেয় তখন অল্প পরিশ্রমে বুকে ব্যথা, চাপ, শ্বাসকষ্ট বা Aodo শুরু হয়ে যায় । চিকিৎসার ভাষায় এটাকে বলে অ্যানজাইনা । তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, হার্ট ব্লক বা ব্রেন স্ট্রোক সৃষ্টিতে কোলেস্টেরলের ভূমিকা কেন্দ্রীয় । যার যত গুড কোলেস্টেরল (HDL) বেশি থাকবে এবং মন্দ কোলেস্টেরল (LDL) কম থাকবে সে ততো নিরাপদ থাকবে ।

কেন এই ভারসাম্যহীন কোলেস্টেরল?

শরীরের চর্বি তৈরীর কারখানা হল লিভার ।যার লিভার চর্বি তৈরীর জন্য যত মুখিয়ে থাকে সে যতই শাকসবজি ঘাস খাক না কেন লিভার তার কাজ চালিয়ে যাবেই । এটা হয় যখন শরীরে মেটাবলিজম পাল্টে যায় । বিশেষ করে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি, অ্যালকোহল পান, বাড়তি ওজন, হাঁটাচলা না করা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো উপস্থিত থাকে । এসব কারণে লিভারের কোষে রিসেপ্টর সমস্যা দেখা দেয় । ফলে অতিরিক্ত মদ্য কোলেস্টেরল রক্তে ভাসতে থাকে । শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে বিশেষ করে হার্ট ও ব্রেনের রক্তনালীর দেয়ালে চর্বির দলা জমে ব্লক তৈরি করতে থাকে ।

প্রতিরোধের উপায় কি? 

ডায়াবেটিসকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে । উচ্চ রক্তচাপের উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে হবে । ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে । ওজন কমাতে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে । প্রয়োজনে চর্বি কমাতে নিয়মিত স্ট্যাটিন জাতীয় ঔষধ খেতে হবে । যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের বয়স 40 হলে সারা জীবনের মতো স্ট্যাটিন খেতে হবে । ডায়াবেটিসের ঔষধ যেমন সারা জীবন খেতে হয় তেমনি চর্বির ঔষধ সারাজীবন খেতে হবে । অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছাড়া স্ট্যাটিন কখনো বন্ধ করা যাবে না । অনেক ডাক্তারকে দেখা যায় চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক হলে ঔষধ বন্ধ করে দেন । এটা ভুল ধারণা ও অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত । ডায়াবেটিসের ঔষধ বন্ধ করলে রক্তের সুগার যেমন বেড়ে যায় তেমনি কোলেস্টেরল এর ঔষধ বন্ধ করলে তা বাড়বেই ।

লক্ষ্যমাত্রা কত?

গুড কোলেস্টেরল (HDL) পুরুষের ক্ষেত্রে ৪০ মিলিগ্রাম এর ওপরে এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৫০ মিলিগ্রাম এর ওপরে থাকতে হবে । মন্দ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা সুস্থ মানুষের জন্য ১৩০ থেকে ১৬০ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকতে হবে । তবে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ক্ষেত্রে ১০০- এর মধ্যে রাখা নিরাপদ । আর যাদের ইতিমধ্যে হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে বা ব্রেন স্ট্রোক অথবা পায়ের রক্তনালীতে ব্লক ধরা পড়েছে তাদের ক্ষেত্রে LDL এর মাত্রা ৭০ মিলিগ্রামের নিচে রাখতে হবে । Triglyceridesএর মাত্রা ২০০ মিলিগ্রাম এর নিচে রাখলে ভালো হয় । 

কি খাবেন?

প্রচুর তাজা শাকসবজি, ফলমূল, উদ্ভিদ প্রোটিন বেশি করে খাবেন ।পর্যাপ্ত মাছ খাবেন, সামুদ্রিক মাছ হলে আরও ভালো । মাংস খেতে চাইলে সপ্তাহে দুইদিন মুরগির মাংস খেতে পারেন, তবে চামড়া, গিলা, কলিজা এসব ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাদ দিয়ে খাবেন । দিনের দুই বেলা ব্রাউন রুটি এবং দুপুরে এক বেলা পরিমিত পরিমাণে ভাত খাবেন ।

কি খাবেন নাঃ

শরীরের মোট চর্বির মাত্র ৮০ শতাংশ তৈরি বা নিয়ন্ত্রণ করে লিভার । বাকি মাত্র ২০ শতাংশ আসে খাদ্য থেকে । তাই চর্বি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য উপাদান এর প্রভাব তুলনামূলক কম । তাসত্ত্বেও প্রাণিজ লাল মাংস যেমন: গরু, খাসি, ভেড়া, দুম্বা, মহিষ, উট, হাঁস এবং ভি, মাখন, সরযুক্ত ঘন দুধ, চিংড়ি, পোলাও, বিরিয়ানি, যে কোন তেলে কড়কড়ে ভাজা খাদ্য ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উত্তম ।



Post a Comment

0 Comments

Close Menu